• Home
  • All News
  • মধ্যবিত্তের চিত্তকথা

মধ্যবিত্তের চিত্তকথা

রতন বাবু সন্ধ্যায় বাজারের ব্যাগটা নিয়ে হেলে দুলে সিঁড়ি বেয়ে উঠছেন।

- না না! বাজারের ব্যাগ যে বেশি বড় তা নয়। বয়সের ভারে তিনি যতোটা না কাহিল তার চেয়ে কাহিল বাজার দর শুনে। এই আগুন লাগা বাজারে তার মত ছাপোষা কর্মচারীর পরিবার পরিজন নিয়ে বেঁচে থাকার যে চাপা আর্তনাদ তা কে বুঝতে পারে?

এখন আফসোস হয় কেনো বালিশ তোলার চাকরীটা নিতে গেলেন না ! কেনইবা ডিজি সাহেবের ড্রাইভারি পেলেন না। আগে মানুষ পকেট ভর্তি টাকা নিয়ে ব্যাগ ভর্তি বাজার করতো আর এখন থলে ভর্তি টাকা নিয়ে দু টাকার পলিথিন ভর্তি বাজার করে আসে।

দেশের নাকি অনেক উন্নতি হয়েছে, মাথাপিছু আয় বেড়েছে। কিন্তুু নিজের মাথার জন্য যেটা হিসাব করা হয়েছে তা তিনি কখনো মিলাতে পারেন নি।

ভাবতে ভাবতে মাথাটাই ভারি হয়ে উঠে। ডায়বেটিসের জন্য খিদে পেলে খালি পেটে থাকা নিষেধ। একটু আগে দশ টাকার ছোলা মুড়ি খেতে গিয়ে----

দোকানদারঃ দাদা দশ টাকার হবে না, পনেরো টাকার নেন। বাজারের অবস্থা ভালো না দাদা।

রতন বাবুঃ দাও কি আর করা।

রিক্সাওয়ালাও পাঁচটা টাকা বাড়তি চেয়ে নিলো। মুড়িওয়ালাও পাঁচ টাকা বাড়িয়ে নিলো। কিন্তুু আমি কার কাছ থেকে হাত পেতে পাঁচটা টাকা বাড়িয়ে নিবো? উত্তর খুঁজে পান না--

ঘরে এসে ফ্রেশ হয়ে সোফায় বসতেই নাতনীটা পাশে এসে টিভি খুলে বসলো। বিটিভি চলছে। করোনার সময় ডিশ লাইনটা কেটে দেয়ার পর আর নেয়া হয় নি।

টিভিতে মন্ত্রী মহোদয় সাক্ষাৎকার চলছে। তার কথায়, দেশে নাকি এখন এতোই উন্নয়ন ঝড়ছে, ধরে রাখার পাত্র নাই। মানুষ এখন গরীব নাই, ত্রানের চাল গরু-ছাগলকে খাওয়াচ্ছে। বেশি বেশি ত্রান দেয়ায় নাকি চাল আলুর দাম বাড়ছে। অথচ আমিতো হাত পেতে ত্রান নিতে পারেন নি। মধ্যবিত্তদের চিত্ততে যতই কান্না থাকুক, তারা বিত্তবানদের মতো হাতও পাততে পারে না, মেরে খেতেও পারে না। এদেশের মানুষ যদি ঘাস খেয়ে বাঁচতে পারতো তাহলে আজকের দুর্মূল্যের বাজারে এটার দামও চড়া হতো।

করোনার মধ্যেও দেশের মাথাপিছু আয় নাকি বেড়েছে। বাড়বে না কেনো। ইউরোপ আমেরিকার মতো চিকিৎসা ব্যবস্থা হওয়ায় ডোনাল্ড ট্রাম্প ও যে এদেশে চিকিৎসা করানোর কথা ভাবছেন। তার উপর দুই নাম্বার মাস্ক, ঔষুধ, জীবানুনাশকে বাজার সয়লাব। টাকায় টাকা শুধু সবদিকে।

আগে যে পান্তাভাত আর আলুভর্তা গরীবের খাওয়া ছিলো তা এখন সোঁনারগা, শেরাটনের খাবার হয়ে গেলো।

আলু ৫০ টাকা, পিঁয়াজ ১০০ টাকা, সরিষা তেল ২০০ টাকা, কাঁচা মরিচ ২৪০ টাকা, লবন ৪০ টাকা, ধনেপাতা ২৪০ টাকা (কেজি)। বরবটি ১০০ টাকা, করলা ৮০ টাকা, পেঁপে ৪০ টাকা, তিতা করলা ১০০ টাকা, লাউ ৪০ টাকা, টমেটো ১২০।

এক আলুভর্তায় এখন ধনী গরীব সমান করে দিলো। আসলেই উন্নতি হয়েছে। বিটিভিতে এগুলা দেখা যায় না।।

নাতনীঃ দাদু দাদু সিন্ডিকেট কি? ওরাই নাকি দাম বাড়াচ্ছে সব কিছুর?

রতন বাবুঃ দাদু ভাই সিন্ডিকেট হলো এমন একটি অদৃশ্য মহামানবীয়, দানবীয়, আর বায়বীয় শক্তি যার কোন অপরাধ, দোষ কিছুই নাই। তাদের দেখা যায় না, ছোঁয়া যায় না, বলা যায় না, ধরাও যায় না। তারা শুধু রক্তচোষা জোঁকের মতো মানুষের সব শুষে নেয়। তারা সব অপরাধের উর্দ্ধে, তাদের ক্ষমতার কাছে সবাই দূর্বলরে মা।

নাতনীঃ দাদু দাদু ঔ দেখো পদ্মা সেতুতে আরও একটা স্প্যান বসলো। কি সুন্দর!! একবার ঘুরতে যাবো কেমন?

রতন বাবু চুপচাপ হাসে আর ভাবে না জানি পদ্মার ওপারে কতো সুখ আর সুখ। ওখানে একটা স্প্যান বসছে আর এদিকে সংসারের ভারে তার মতো লাখো গরীবের বুকে পাথরের চাপ বসছে তা দেখার কেউ নেই, কেউ না, কেউই না।

মেয়ের সাথে সাথে নাতনীটাও বড় হচ্ছে। বাহিরে লোলুপ দৃষ্টির হাজারো চোখ বাঁচিয়ে সবাই কে নিয়ে যে শান্তিতে থাকবেন তার নিশ্চয়তা কই? হাজারো সমস্যায় জর্জরিত দেশে খুন, ধর্ষনের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড করে কি লাভ যেখানে বিচারের বানী নিভৃতে কাঁদে। বিচারের রেলগাড়ীতে চড়ার পর সর্বোচ্চ শাস্তি দেখতে দেখতে পরপারের ডাক চলে আসে।

দীর্ঘশ্বাসটা আরো দীর্ঘ হয়। মনের অজান্তেই বের হয় -----

''এই বেশ ভালো আছি। মৃতপ্রায় চিত্ত নিয়ে মধ্যবিত্ত হয়ে বেঁচেতো আছি"


বিঃ দ্রঃ এটা একটা কাল্পনিক ভাবনা। কার সাথে মিলে গেলে নিছক কাকতালীয়।


লেখাঃ অসীম চৌধুরী, 

সমাজ কর্মী।     

Most Read

Popular News