• Home
  • All News
  • ইহুদী-মুসলিম লাগাতার বচসার মাঝেও রয়েছে অনেক সাদৃশ্য

ইহুদী-মুসলিম লাগাতার বচসার মাঝেও রয়েছে অনেক সাদৃশ্য

মিসবাহ উদ্দিন তারেকঃ

মুসলিম ও ইহুদীদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব ঐতিহাসিক ও দীর্ঘদিনের। যুগের পর যুগ এই কলহ চলমান। এই বচসার সর্বশেষ চিহ্ন আমরা ফিলিস্তিনে দেখতে পায়।

বেশ কিছু দিন ধরে বিভিন্ন ধর্মের ব্যাপারে বিস্তর জানার আগ্রহ জন্মানোর কারনে এক প্রকার রিসার্চ করে ফেলছি। বিশেষ করে ইহুদী ধর্মের ব্যাপারে আগে ছিটে ফোটাও ধারনা ছিলো না। তাই জানার আগ্রহের কারনে এদের ধর্মের ব্যাপারে অনেক কিছু জেনেছি।

আমরা ইহুদী ও মুসলিমদের মধ্যে শত্রুতার বিষয়েই এতোদিন জানতাম। এতো বিভক্তির মাঝেও দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মাঝে রয়েছে অনেক ঐতিহাসিক সাদৃশ্য।


১. মুসলমান ও ইহুদীরা স্ট্রিক্টলি এক ঈশ্বরবাদে বিশ্বাসী। সৃষ্টিকর্তা এক এবং তাঁর কোন শরীক নেই।

২. মুসলমান ও ইহুদীদের মতে তাদের জাতির পিতা হযরত ইব্রাহীম (আঃ) / আব্রাহাম। সমগ্র মানব জাতির পিতা হযরত আদম (আঃ) / অ্যাডাম।

৩. মুসলমানরা প্রতিদিন পাঁচ বার (ভোরে , দুপুরে, বিকেলে, সন্ধ্যায় ও রাতে) নামাজ পড়ে । ইহুদীরা প্রতিদিন তিন বার (ভোরে, দুপুরে ও রাতে) প্রার্থনা করে। ইহুদী মতে একজন ইহুদী মুসলমানদের মসজিদে প্রার্থনা করতে পারবে কিন্তু খ্রিষ্টানদের চার্চের ধারের কাছেও যাওয়ার অনুমতি নেই।

৪. শুধু এই দুই ধর্মেই প্রার্থনার জন্য কিবলা (দিক) আছে । মুসলমানদের কিবলা মক্কার কাবা ও ইহুদীদের কিবলা (দিক) জেরুজালেমের প্রার্থনা স্থান। যদিও অনেক আগে মুসলিমদের কিবলাও জেরুজালেম ছিলো।

৫. মুসলমানদের জীবনে একবার হজ্জ্ব করতে হয় মক্কায়। ইহুদীদের বছরে তিনবার তীর্থ যাত্রা করতে হয় জেরুজালেমে।

৬. মুসলমান ও ইহুদী পুরুষদের খাতনা (circumcision) করতে হয়।

৭. দাড়ি রাখতে দুই ধর্মেই বলা আছে। দাড়ি কাটা দুই ধর্মের দৃষ্টিতে গুনাহ / পাপ।

৮. সম্পদ দান করা দুই ধর্মেই অবশ্য পালনীয় বিষয়। মুসলমানরা নিজের সম্পদের একটি অংশ যাকাত হিসেবে দেয়। ইহুদীরা তাদের সম্পদের একটি অংশ প্রতি বছর চ্যারিটি হিসেবে দেয়।

৯. মুসলমানরা কোন ব্যাক্তিকে দেখলে সালাম দেয়। 'আস সালামু আলাইকুম'। ইহুদীরা কোন ব্যাক্তিকে দেখলে সালোম / শালোম দেয়। 'শালোম আলাইকুম'।

১০. দুই ধর্মেই ধর্মীয় বিশেষ আইন রয়েছে। মুসলমানদের জন্য শরীয়াহ আইন। ইহুদীদের জন্য হালাখা আইন। এই দুই আইনেরই শাস্তির বিধান অত্যন্ত কঠোর। জেনা (বিয়ে বহির্ভুত শারীরিক সম্পর্ক) করা এই আইন অনুসারে মারাত্নক অপরাধ। জেনা করলে মুসলমানদের শরীয়াহ আইন মোতাবেক ১০০ বেত্রাঘাত। ইহুদীদের হালাখা আইন মোতাবেক পাথর ছুড়ে হত্যা করা। চুরি করলে শরীয়াহ শাস্তি হচ্ছে হাত কাটা ও কিছুক্ষেত্রে হাত , পা উভয়ই কাটা / ডান হাত কাটা সাথে বাম পা কাটা অথবা বাম হাত কাটা সাথে ডান পা কাটা। ইহুদী ধর্মে চুরির শাস্তি 'দাসত্ব' বা 'কান কেটে দেয়া', এছাড়া বিভিন্ন অপরাধে হালাখা শাস্তির মধ্যে আছে দোররা মারা। শরীয়াহ শাস্তির মধ্যেও আছে দোররা মারা।

১১. ইসলাম ধর্ম মতে শুক্রবার সপ্তাহের পবিত্র দিন ও বিশেষ ইবাদতের দিন (জুম্মার নামাজ) । ইহুদী ধর্ম মতে শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত সপ্তাহের পবিত্র সময় ও বিশেষ প্রার্থনার সময় (শাব্বাত)।

১২. দুই ধর্মেই নির্দিষ্ট খাবারের অনুমতি আছে। মুসলমানদের জন্য

হালাল খাবার। ইহুদীদের জন্য কোশার খাবার। দুই ধর্ম মতেই পশুর রক্ত ও শুকরের মাংস কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। একজন মুসলমান ইহুদীদের কোশার খাবার খেতে পারবে। একজন ইহুদী মুসলমানদের হালাল খাবার খেতে পারবে। তবে মুসলমানদের জন্য কোশারের মধ্যে অ্যালকোহল খাওয়ার অনুমতি নেই কারন অ্যালকোহল খাওয়া মুসলমানদের জন্য হারাম।

১৩. পশু জবাইয়ের নিয়ম দুই ধর্মেই প্রায় এক ধরনের। মুসলমানেরা প্রতিটি পশু জবাইয়ের আগে আল্লাহর নাম স্মরন করে। ইহুদীরা শুধু একবার প্রভুর নাম স্মরন করে একসাথে সব পশু জবাই করে।

১৪. মেয়েদের ক্ষেত্রে দুই ধর্মেই মাথায় কাপড় দেয়ার বিধান আছে তবে ইসলাম ধর্মে মেয়ে প্রাপ্ত বয়স্ক হলেই মাথায় কাপড় দেয়ার বিধান আছে। আর ইহুদী ধর্মে মেয়ে বিয়ে করলে মাথায় কাপড় বাধা ও লম্বা কাপড় পরার বিধান আছে। নারী ও পুরুষের শালীন কাপড় পরার বিধান দুই ধর্মে আছে।

১৫. পুরুষের টুপি পড়ার বিধান দুই ধর্মে আছে। দুই ধর্মের লোকদের টুপি পুরোপুরি এক না। মুসলমানদের টুপির চেয়ে ইহুদীদের টুপি ছোট।

১৬. ইবাদত / প্রার্থনার অংশ হিসেবে সারাদিন পানাহার থেকে বিরত থাকা দুই ধর্মেই আছে। মুসলমানদের রমজান মাসের প্রতিদিন রোযা রাখা ফরজ আর ইহুদীদের বছরে পাঁচটি বিশেষ দিনে পানাহার থেকে বিরত থাকা অবশ্য পালনীয়।

১৭. সন্তান জন্ম নিলে মুসলমানদের অনেকে বাচ্চার কানের কাছে আযান দেয়। ইহুদীরা অনেকে বাচ্চার কানের কাছে শিমা দেয়।

১৮. দুই ধর্মেই সুদ নিষিদ্ধ।

১৯. ধর্মীয় দিনপুঞ্জিকায় মাস নতুন চাঁদ দেখে ঠিক করা হয়।

২০. সন্তানের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে রাখার সময় ছাগল বা ভেড়া জবাই দেয়া ধর্মের বিধান।

২১. অমুসলিমদের 'কাফের' বলা হয় আর ইহুদীদের মতে অন্য ধর্মের অনুসারীরা 'জেন্টাইল'।

২২. কোরআন অনুসারে অমুসলিমদের মধ্যে একমাত্র ইহুদী-নাছারা জাতির নারীর সাথে মুসলিম পুরুষের বিয়ের অনুমতি আছে। আলেম ওলামাদের মতে এই বিয়ে জায়েজ হবে তবে তা মাকরুহ / পছন্দনীয় কাজ না। এই ধরনের বিয়ে করলে শর্ত হলো সন্তান মুসলিম হতে হবে।

২৩. দুই ধর্ম মতেই জেরুজালেম হচ্ছে পবিত্র নগরী (Holy City) । মুসলিমদের জন্য মক্কা হচ্ছে সবচেয়ে পবিত্র নগরী তারপর মদীনা তারপর জেরুজালেম। ইহুদীদের জন্য জেরুজালেম সবচেয়ে পবিত্র নগরী। আগে মুসলিমদের কিবলা জেরুজালেমে ছিলো। পরে আল্লাহর নির্দেশে মক্কা নগরীর কাবা হয় মুসলিমদের কিবলা।